*যাত্রার শুরুতেই ৯০ শতাংশের বেশি গলে যাওয়ার দাবি; বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ের দ্রুত উষ্ণায়ন, কম তুষারপাত ও মানবসৃষ্ট চাপ মিলেই তৈরি হয়েছে সংকট*
অমরনাথ যাত্রা চলাকালীন জম্মু-কাশ্মীরের পবিত্র অমরনাথ গুহায় স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া বরফের শিবলিঙ্গ বা ‘বাবা বরফানি’ এ বছর অস্বাভাবিক দ্রুত গলে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৫৭ দিনের যাত্রা শুরুর অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বরফ শিবলিঙ্গের ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ গলে গেছে। যদিও বরফ শিবলিঙ্গ প্রতিবছরই প্রাকৃতিক কারণে গলে যায়, তবে এ বছরের গলনের গতি অতীতের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
প্রতি বছর বরফের ফোঁটা জমে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় এই শিবলিঙ্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৮৮৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত অমরনাথ গুহা দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তুষারপাতের ধরণে পরিবর্তন এবং জলবায়ুর অস্বাভাবিক আচরণ এই প্রাকৃতিক বরফ গঠনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
পরিবেশ ও হিমবাহ বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় বর্তমানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় হিমবাহ সঙ্কুচিত হচ্ছে, বরফের স্তর কমছে এবং তুষার দ্রুত গলছে। এর প্রভাব শুধু হিমবাহেই নয়, অমরনাথের মতো প্রাকৃতিক বরফ গঠনেও পড়ছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত ড. একলব্য শর্মার মতে, হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে গত দুই দশকে বরফ ও হিমবাহের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০০০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে হিমালয়ে বরফ ও হিমবাহের আয়তন ২৩ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে এবং ২০১০ সালের পর এই ক্ষয়ের গতি আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, পশ্চিম হিমালয়, যেখানে অমরনাথ গুহা অবস্থিত, সেখানে উষ্ণায়নের প্রভাব বিশেষভাবে স্পষ্ট।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হিমালয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক বি.ডব্লিউ. পাণ্ডের পর্যবেক্ষণ, আগে বরফ শিবলিঙ্গ ধীরে ধীরে এক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে গলত। কিন্তু এ বছর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তার অধিকাংশ অংশ গলে যাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট সংকেত। তাঁর মতে, হিমালয়ের তুষাররেখা ক্রমশ আরও উঁচুতে সরে যাচ্ছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমগ্র পর্বত বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তন নয়, অমরনাথ যাত্রায় বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রীর উপস্থিতিও গুহার ক্ষুদ্র জলবায়ু বা মাইক্রো-ক্লাইমেটকে প্রভাবিত করছে। এ বছর যাত্রার প্রথম চার দিনেই ৯৩ হাজারের বেশি ভক্ত দর্শন করেছেন বলে জানা গেছে। হাজার হাজার মানুষের শরীরের তাপ, গুহার ভেতরে আর্দ্রতা বৃদ্ধি, আলো, বিদ্যুৎ, রান্নাঘর, অস্থায়ী অবকাঠামো এবং যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতির তাপও বরফ দ্রুত গলতে সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
আইআইটি বোম্বের অধ্যাপক শর্মিষ্ঠা পট্টনায়কের মতে, অমরনাথের সমস্যাকে শুধুমাত্র পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। ধর্মীয় পর্যটনের চাপ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বন উজাড় এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন—সব মিলিয়েই এই সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার বিষয়টি মাথায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
পরিবেশবিদদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শনার্থীর প্রবেশ, গুহার আশপাশে স্থায়ী নির্মাণ সীমিত করা, উচ্চ তাপ উৎপন্নকারী অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ এবং সংবেদনশীল হিমালয় অঞ্চলে পরিবেশ সুরক্ষার কঠোর নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, গত বছরের পাহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর এ বছর আবারও বিপুল সংখ্যক ভক্ত অমরনাথ যাত্রায় অংশ নিয়েছেন। তবে বরফ শিবলিঙ্গের দ্রুত গলন নতুন করে হিমালয়ের পরিবেশগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি ধর্মীয় প্রতীক নয়, বরং হিমালয়ের পরিবর্তিত জলবায়ুরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।