উত্তরবঙ্গে অব্যাহত ভারী বর্ষণের জেরে ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তিস্তা নদীর জলস্তর। লাগাতার বৃষ্টিতে নদীর জল বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় কালিম্পং জেলার তিস্তাবাজার ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় নদীর জল রাস্তার উপর উঠে আসায় সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় যান চলাচল। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে খবর, গত কয়েকদিন ধরে উত্তরবঙ্গের পাহাড় এবং সমতল এলাকায় টানা বৃষ্টিপাতের ফলে তিস্তা নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। রবিবার রাত থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। গভীর রাতে পাহাড়ি ঢল নামতে শুরু করলে ভোরের দিকে তিস্তার জল বিপজ্জনকভাবে ফুলে ওঠে এবং তিস্তাবাজার সংলগ্ন নিচু এলাকায় জল ঢুকতে শুরু করে।
### রাস্তার উপর দিয়ে বইছে নদীর জল
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে তিস্তা–পেশক সড়কে। জল রাস্তার উপর উঠে আসায় নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু সময়ের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে জল কিছুটা নেমে গেলে সীমিত পরিসরে যান চলাচল শুরু হলেও পরিস্থিতির উপর এখনও কড়া নজর রাখছে প্রশাসন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গভীর রাত থেকে নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে শুরু করে। প্রবল স্রোতে নদীর পাড় ভাঙার আশঙ্কাও তৈরি হয়। একাধিক এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ রাতেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
### মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে বাসিন্দাদের
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রশাসনের তরফে নদী তীরবর্তী এলাকায় লাগাতার মাইকিং করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে নদীর ধারে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নদীর পাড় সংলগ্ন নিচু এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এছাড়াও সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সিভিল ডিফেন্স কর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন পড়লে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার জন্য সব ধরনের সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
### অতীতের স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে তিস্তার রুদ্ররূপ
উত্তরবঙ্গে বর্ষা এলেই তিস্তার রুদ্ররূপ নতুন নয়। বিগত কয়েক বছরে একাধিকবার ভয়াবহ বন্যার সাক্ষী থেকেছে তিস্তা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা। কখনও রাস্তা ভেসে গিয়েছে, কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেতু, আবার কখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পাহাড়ের সঙ্গে সমতলের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবারও প্রশাসন আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কারণ, আবহাওয়া দফতর আগামী কয়েকদিন উত্তরবঙ্গে আরও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।
### আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সক্রিয় মৌসুমি অক্ষরেখা এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আগামী কয়েকদিন উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে তিস্তা ছাড়াও তোর্সা, জলঢাকা, রায়ডাক এবং অন্যান্য পাহাড়ি নদীর জলস্তরও আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আবহাওয়াবিদরা।
### আপাতত কী পরিস্থিতি?
সোমবার সকাল থেকে কিছু এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা সামান্য কমেছে। এর জেরে তিস্তার জলস্তরও কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে বলে খবর। বেশ কয়েকটি রাস্তা থেকে জল নামতে শুরু করায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে যান চলাচল। তবে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রশাসনের তরফে লাগাতার নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং যে কোনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবরকম প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গে আগামী কয়েকদিন আবহাওয়া কেমন থাকে, তার উপরই নির্ভর করবে পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।