উত্তরবঙ্গে অবিরাম বৃষ্টির জেরে ক্রমশ জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি। পাহাড় থেকে সমতল— একাধিক জেলায় নদীর জলস্তর বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিভিন্ন এলাকায় জল ঢুকেছে রাস্তায়, কোথাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গ্রাম। এরই মধ্যে জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা থেকে উঠে এল মানবিকতার এক বিরল ছবি, যা একদিকে যেমন আবেগ ছুঁয়েছে, তেমনই তুলে ধরেছে এলাকার পরিকাঠামোগত দুরবস্থার চিত্র।
নাগরাকাটার চেংমারি চা বাগান সংলগ্ন এলাকায় স্কুলে পৌঁছতে প্রতিদিন প্রাণের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে ছোট ছোট পড়ুয়াদের। উত্তাল নদী পার করে শিশুদের স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন শিক্ষকরা। কখনও কাঁধে, কখনও কোলে তুলে নদী পার করিয়ে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে খুদেদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে ভুটানের পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের জেরে সীমান্তবর্তী একাধিক নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তার জেরে নাগরাকাটা এলাকার কালিখোলা নদীও ফুলেফেঁপে উঠেছে। নদীর স্রোত এতটাই তীব্র যে ছোট পড়ুয়াদের পক্ষে একা নদী পার হওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ডুয়ার্সের চেংমারি চা বাগানের মানা লাইন এলাকার বাসিন্দারা। এই গ্রামের পড়ুয়ারা লোয়ার চেংমারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু স্কুলে যেতে হলে তাদের নদী পার করতেই হয়।
সমস্যার সূত্রপাত গত বছরের ভয়াবহ বন্যার পর। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বন্যার জেরে গ্রাম ও বিদ্যালয়ের মধ্যে সংযোগকারী সেতুটি ভেঙে যায়। দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও এখনও নতুন সেতু নির্মাণ হয়নি। ফলে নদীই এখন গ্রামবাসীদের একমাত্র যাতায়াতের পথ।
প্রতিদিন সকাল হলেই নদীর পাড়ে হাজির হন স্কুলের শিক্ষকরা। ছোট ছোট পড়ুয়াদের নিরাপদে স্কুলে পৌঁছে দিতে তাঁরা নিজেরাই দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন কাঁধে। স্কুল ছুটির পর ফের একইভাবে শিশুদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।
শুধু শিক্ষকই নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও এই কাজে এগিয়ে আসছেন। গ্রামের প্রবীণ ও যুবকেরা মিলে শিশুদের নদী পারাপারে সাহায্য করছেন। তবে বর্ষা আরও তীব্র হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
গ্রামবাসীদের দাবি, অবিলম্বে ওই এলাকায় একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক। কারণ, বর্ষাকালে প্রতি বছর একই সমস্যার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। শুধু স্কুলপড়ুয়ারাই নয়, অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতও চরমভাবে ব্যাহত হয়।
এদিকে আবহাওয়া দফতর উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা-সহ বিভিন্ন নদীর জলস্তর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসন পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে এবং নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও শিশুদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, তার জন্য শিক্ষকদের এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই বহু মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধানে দ্রুত পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি জোরালো হচ্ছে।