২০২৬ ভারতীয় পাসপোর্টকে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষ নাগরিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল হিসেবে দেখে এসেছেন। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি ব্যাখ্যাকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সরকারের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, পাসপোর্ট মূলত আন্তর্জাতিক যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত একটি সরকারি নথি, এটি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত আইনি প্রমাণ নয়।
বিদেশ মন্ত্রকের এক আধিকারিকের মন্তব্য সামনে আসার পরই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, পাসপোর্টের প্রধান উদ্দেশ্য বিদেশ সফরের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও ভ্রমণের অনুমোদন নিশ্চিত করা। তবে শুধুমাত্র এই নথির ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা যায় না।
এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, যদি পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তাহলে এত কঠোর যাচাই, পুলিশি তদন্ত এবং নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার প্রয়োজন কেন?
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, পাসপোর্ট ইস্যু করা এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণ—দুটি সম্পূর্ণ পৃথক আইনি প্রক্রিয়া। পাসপোর্ট দেওয়া হয় পাসপোর্ট আইন, ১৯৬৭-এর আওতায়। অন্যদিকে একজন ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, তা নির্ধারিত হয় নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ অনুসারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পাসপোর্ট কোনও ব্যক্তির পরিচয় ও জাতীয়তার ইঙ্গিত বহন করলেও আইনি বিচারে নাগরিকত্বের একমাত্র ও চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে এটিকে ধরা হয় না। অতীতে বিভিন্ন আদালতের পর্যবেক্ষণেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে বাস্তব ক্ষেত্রে পাসপোর্ট এখনও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং শক্তিশালী পরিচয়পত্রগুলির একটি। আন্তর্জাতিক স্তরে কোনও দেশের পাসপোর্ট সাধারণত সেই দেশের নাগরিক হিসেবেই স্বীকৃত হয়। ফলে সরকারি ব্যাখ্যা ও সাধারণ মানুষের ধারণার মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাক রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই বিতর্কের জেরে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—তাহলে নাগরিকত্বের প্রকৃত প্রমাণ কী?
সরকারি সূত্রের মতে, জন্ম সনদ, নাগরিকত্ব সনদ অথবা নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী প্রাপ্ত অন্যান্য নথি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে জন্মের সময়, জন্মস্থান এবং পিতামাতার নাগরিকত্বের উপরও বিষয়টি নির্ভর করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড বা পাসপোর্ট—প্রতিটি নথির আলাদা উদ্দেশ্য রয়েছে। কোনও একটি নথি সবক্ষেত্রে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি দূর করতে আরও স্পষ্ট সরকারি নির্দেশিকা প্রয়োজন বলেই মত একাংশের।
এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে দেশের নাগরিক নথি ব্যবস্থার জটিলতা এবং একটি একক, সর্বজনস্বীকৃত নাগরিকত্ব প্রমাণপত্রের প্রয়োজনীয়তা।