ভারত-জাপান সম্পর্কে নতুন অধ্যায়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থেকে AI—দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় একাধিক বড় ঘোষণা আজ*

ভারত-জাপান সম্পর্কে নতুন অধ্যায়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থেকে AI—দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় একাধিক বড় ঘোষণা আজ*

admin
4 Min Read

নয়াদিল্লি:*
ভারত ও জাপানের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও যৌথ ঘোষণা সামনে আসতে চলেছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এবারের সফরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে *”জয়েন্ট ডিক্লারেশন অন ইকোনমিক সিকিউরিটি কো-অপারেশন”*, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন মাত্রা দেবে।

এই ঘোষণার মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ভারত-জাপান বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের কেন্দ্রে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), পরিষ্কার জ্বালানি, কৌশলগত খনিজ, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার রূপরেখা তৈরি হবে।

### *AI-তে আলাদা যৌথ ঘোষণা*

সূত্রের খবর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নিয়ে দুই দেশ একটি পৃথক যৌথ বিবৃতিও প্রকাশ করতে পারে। সেখানে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, শিল্পক্ষেত্রে AI-এর ব্যবহার, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং AI-এর দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে AI-কে কেন্দ্র করে ভারত ও জাপানের এই অংশীদারিত্ব এশিয়ার প্রযুক্তিগত ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

### *সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি শিল্পে জোর*

চীন-নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তুলতে ভারত ও জাপান ইতিমধ্যেই একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। এবারের বৈঠকে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, বায়োগ্যাস, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং আধুনিক উৎপাদন শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

### *সবুজ জ্বালানিতে বড় পরিকল্পনা*

পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দুই দেশ। জানা গেছে, ভারতে একটি বৃহৎ *গ্রিন অ্যামোনিয়া প্ল্যান্ট* স্থাপনে জাপান সহযোগিতা করতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাহাজ চলাচল, সার শিল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

### *কৌশলগত খনিজ সম্পদে সহযোগিতা*

ইলেকট্রিক গাড়ি, ব্যাটারি এবং নবায়নযোগ্য শক্তি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় লিথিয়াম, কোবাল্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারত ও জাপান নতুন সমঝোতা করতে পারে। খনিজ অনুসন্ধান, প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হবে।

### *ইলেকট্রিক ও হাইড্রোজেন যানবাহনে যৌথ উদ্যোগ*

‘নেক্সট জেনারেশন মোবিলিটি পার্টনারশিপ’-এর আওতায় বৈদ্যুতিক যান, হাইড্রোজেনচালিত যান, স্মার্ট ও সংযুক্ত পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে যৌথ গবেষণা ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

### *প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব*

বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়েও আলোচনা হবে। এছাড়া ভারতের *MAHASAGAR (Mutual and Holistic Advancement for Security and Growth Across Regions)* উদ্যোগেও জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

### *১২০টি নতুন বাণিজ্যিক চুক্তির সম্ভাবনা*

দুই দেশের বেসরকারি সংস্থার মধ্যে উৎপাদন, অবকাঠামো, পরিষ্কার জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন খাতে প্রায় *১২০টি সমঝোতা স্মারক (MoU)* সই হতে পারে।

এর আগে ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জাপান সফরে ভারতীয় অর্থনীতিতে *১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন* বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল টোকিও। এবার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।

### *ভারত-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান চিত্র*

বর্তমানে ভারত-জাপান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় *২৭.৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপান ইতিমধ্যেই ভারতে প্রায় **৪৫ বিলিয়ন ডলার* বিনিয়োগ করেছে এবং ভারতের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে রয়েছে।

দেশজুড়ে বর্তমানে ১,৪০০-রও বেশি জাপানি সংস্থা প্রায় ৫,২০০টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছে। বিশেষ করে উৎপাদন শিল্পে জাপানি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

### *ভবিষ্যতের রোডম্যাপ*

দুই দেশ ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, উন্নত স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা, নতুন উপাদান প্রযুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যৌথ গবেষণার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালে ভারত-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন যৌথ কর্মসূচিরও পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের ভারত-জাপান শীর্ষ বৈঠক শুধু নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনাই নয়, বরং আগামী এক দশকের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার দিকেই বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *