*মস্কো:* একটানা প্রায় *৯,২৮৯ কিলোমিটার* পথ, টানা *৬ থেকে ৭ দিনের যাত্রা, আর মাঝপথে **৮টি টাইম জোন* অতিক্রম—এটাই বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় *ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে। রাশিয়ার রাজধানী **মস্কো* থেকে প্রশান্ত মহাসাগর তীরের শহর *ভ্লাদিভোস্তক* পর্যন্ত বিস্তৃত এই রেলপথকে বিশ্বের দীর্ঘতম একটানা রেলপথ হিসেবে ধরা হয়।
এই ঐতিহাসিক রেলপথ শুধু একটি পরিবহণ ব্যবস্থা নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম বড় প্রকৌশল কীর্তি হিসেবেও পরিচিত। *১৮৯১ সালে* রুশ সম্রাট *জার আলেকজান্ডার তৃতীয়-এর আমলে এই রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রায় **২৫ বছর* ধরে হাজার হাজার শ্রমিক দুর্গম পাহাড়, ঘন জঙ্গল, বিশাল নদী এবং তুষারাবৃত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে রেললাইন নির্মাণ করেন। অবশেষে *১৯১৬ সালে* সম্পূর্ণ হয় এই মহাপ্রকল্প।
মস্কো থেকে যাত্রা শুরু করে ট্রেনটি *৮০টিরও বেশি শহর ও জনপদ* অতিক্রম করে। পথের মধ্যে পড়ে *ইউরাল পর্বতমালা*, যা ইউরোপ ও এশিয়ার প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে পরিচিত। এরপর শুরু হয় বিস্তীর্ণ সাইবেরিয়ার বনাঞ্চল, তৃণভূমি, নদী ও বরফে ঢাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
এই যাত্রার অন্যতম আকর্ষণ *লেক বাইকাল। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই হ্রদ বিশ্বের **সবচেয়ে গভীর স্বাদু জলের হ্রদ* এবং পৃথিবীর অবমুক্ত স্বাদু জলের প্রায় *২০ শতাংশ* এখানেই সংরক্ষিত। ট্রেনের জানালা থেকে বাইকালের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন।
যাত্রাপথে ট্রেনটি *৮টি পৃথক সময় অঞ্চল* অতিক্রম করে। ফলে প্রতিদিন সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময় বদলে যায় এবং যাত্রীদের ঘড়িও বারবার পরিবর্তন করতে হয়। এই অভিজ্ঞতা বিশ্বের খুব কম রেলপথেই সম্ভব।
ট্রেনে রয়েছে সাধারণ স্লিপার থেকে ব্যক্তিগত কেবিনের সুবিধা, ডাইনিং কার এবং প্রতিটি কোচে ঐতিহ্যবাহী *’সামোভার’*, যেখানে সারাক্ষণ গরম জল পাওয়া যায়। যাত্রীরা সেই জল ব্যবহার করে চা, কফি বা ইনস্ট্যান্ট খাবার তৈরি করেন।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়; বরং এই যাত্রাই নিজেই একটি গন্তব্য। ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং বিশ্বের দীর্ঘতম রেলপথে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে উপভোগ করার সুযোগ করে দেয় এই কিংবদন্তি রেলপথ।